সর্বশেষ
Home / জাতীয় / যাচাইয়ের চেয়ে গ্রেফতারেই আগ্রহ বেশি পুলিশের

যাচাইয়ের চেয়ে গ্রেফতারেই আগ্রহ বেশি পুলিশের

শাহবাগ থানার তৎকালীন এসআই মুস্তাফিজ ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি ওয়ারেন্ট (পরোয়ানা) নিয়ে রাজধানীর হাতিরপুলে আবদুল মান্নানের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে হাজির হন।

গাঁজা বিক্রির দায়ে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারির কথা পুলিশ কর্মকর্তার কাছে শুনে মান্নানের মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড়। এসআই মুস্তাফিজ তাকে ওয়ারেন্ট দেখিয়ে বলেন, গাঁজা বিক্রির দায়ে শেরপুর থানায় আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং সেই মামলায় ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে।

পরে থানায় গিয়ে ওসির পরামর্শে পরদিনই শেরপুর আদালতে যান আবদুল মান্নান। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সবই ভুয়া। আসামির নাম, মামলা নম্বর, তারিখ, রেফারেন্স নম্বর কোনো কিছুরই ঠিক নেই। আদালত তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেন।

কথা হয় ঘটনার শিকার আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার ধারণা, একটি মানি এক্সচেঞ্জ ক্রয়কে কেন্দ্র করে পূর্বশত্রুতাবশত হয়রানি ও সামাজিকভাবে হেয় করতে আমার বিরুদ্ধে ভুয়া ওয়ারেন্ট বের করানো হয়েছে। এ ঘটনায় এসআই মুস্তাফিজও জড়িত থাকতে পারেন। কেননা, সাধারণত মামলা নম্বর ওয়ারেন্টের গায়ে যেভাবে লেখা থাকে, ওই ভুয়া ওয়ারেন্টে সেভাবে লেখা ছিল না।

বিষয়টি সাধারণ মানুষের জানার কথা না থাকলেও পুলিশের জানার কথা। বিস্ময়কর হচ্ছে- ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি দেখালেও তিনি আমলে নেননি। কোনো কিছু যাচাই না করে জড়িতদের সঙ্গে যোগসাজশে তিনি কাজটি করেছেন।

এর আগেও আমার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে ইয়াবা রেখে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল ওই শত্রুপক্ষ।’ বর্তমানে কলাবাগান থানায় পোস্টিং এসআই মুস্তাফিজের। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ওয়ারেন্ট নিয়েই গ্রেফতার অভিযানে গিয়েছিলেন। অবৈধ কিছু করা হয়নি। ওয়ারেন্ট থানায় আসার পর তা যাচাই করার সুযোগ আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়ারেন্ট ভুয়া কিনা তা কোর্ট দারোগা আছেন, তার কাছে ফোন করে জানা যায়। এখানে সময়ের বিষয় আছে। তবে আবদুল মান্নানের ক্ষেত্রে তা যাচাই করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

শুধু আবদুল মান্নানই নন, ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। থানায় কোনো মামলা না থাকার পরও নির্দিষ্ট আদালতের সিলসংবলিত ওয়ারেন্ট নিয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে থানায়। শুধু তাই নয়, এমন ভুয়া ওয়ারেন্টে হাজতবাসের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা ও জবাবদিহিতার অভাবে দুষ্টচক্র কাজটি করে যাচ্ছে অবলীলায়। জানা গেছে, এ সিন্ডিকেটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পুলিশ ও আদালতের কর্মচারীরা জড়িত। এ চক্রটি বরাবরই পার পেয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়ারেন্ট সঠিক কিনা তা যাচাই না করা, আদালত পুলিশের (জেনারেল রেকর্ড অফিসার-জিআরও) দেয়া ওয়ারেন্ট ফরমের হিসাব না নেয়ার সঙ্গে শাস্তির নজির না থাকায় এ ধরনের হয়রানি কমছে না।
জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক যুগান্তরকে বলেন, বিনা অপরাধে একজন ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে সবার সামনে থানায় ধরে নিয়ে গেলে ওই লোকটা অপরাধ না করলেও সমাজে অপরাধী হিসেবে পরিচিত হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মানবাধিকার লংঘনের পাশাপাশি তার কাজের ক্ষতির সঙ্গে সামাজিকভাবে তিনি হেয় প্রতিপন্ন হন।

থানায় আসার পর ওয়ারেন্ট ভুয়া কিনা তা অবশ্যই যাচাই করা উচিত। কেননা যে লোকটার নামে ওয়ারেন্ট এলো, সে লোকটা আদৌও খারাপ কিনা তা যাচাই করে দেখা সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ যদি যাচাই করে তাহলে ভুক্তভোগীরা আদালতে যাওয়ার আগেই হয়রানি থেকে রেহাই পেতে পারেন।

এ জন্য কোর্টের জিআরও ও কোর্ট ইন্সপেক্টরদের আরও সতর্ক হতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি আদালতের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা লোকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এক শ্রেণীর দুষ্ট প্রকৃতির লোক আছে যারা এ কাজগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগে একটা প্রথা কোর্টে চালু ছিল- ‘পারসন নন-গ্রেড’ (একজন অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি) ঘোষণা দেয়া।

এর আগে যারা কোর্টে ঘোরাঘুরি করত, দালাল ও দুষ্টচক্রের লোকেরা যারা মানুষকে হয়রানি করত- তাদের আদালত থেকে পারসন নন-গ্রেড ঘোষণা করা হতো। থানার ওসির দায়িত্ব দুষ্ট লোক চিহ্নিত করে আদালতের মাধ্যমে তাদের পারসন নন-গ্রেড ঘোষণার ব্যবস্থা করা।

বিশেষজ্ঞরা এ জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করেছেন সেগুলো হল : ওয়ারেন্ট হাতে আসার পর তা যাচাই না করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গ্রেফতার অভিযানে নেমে পড়ছেন; আদালতে জিআরওদের কাছ থেকে সরবরাহকৃত ওয়ারেন্টের কোনো হিসাব না নেয়া ও হাত বাড়ালেই মিলছে ওয়ারেন্টের ফরম; ভেন্ডারদের কাছেও পাওয়া যাচ্ছে ওয়ারেন্ট ফরম।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, ‘মূলত পূর্বশত্রুতা বা বিরোধ থেকেই এই ভুয়া ওয়ারেন্ট ইস্যু করানো হয়। থানায় ওয়ারেন্ট এলে আসামি গ্রেফতার করাই শুধু পুলিশের কাজ নয়। ওয়ারেন্ট ভুয়া কিনা তা যাচাই করা উচিত।

এ ছাড়া ওয়ারেন্টগুলোতে জিআরও সেকশন থেকে বিভিন্ন সিল দেয়া হয়। ওই দুষ্টচক্রের সঙ্গে জিআর সেকশনের স্টাফরাও জড়িত থাকেন। বিচারকদের সিলগুলো আরও সাবধানে রাখা উচিত। যেন এর অপব্যবহার না হয়। একই সঙ্গে আদালতের আরও সতর্কতার পাশাপাশি ফরমগুলো দেয়ার ব্যাপারে একটা হিসাব থাকা উচিত। ওয়ারেন্ট ফরম যেন যার-তার হাতে না পড়ে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।’

জানতে চাইলে আদালতে পুলিশের অপরাধ ও তথ্য প্রসিকিউশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মিরাশ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম ওয়ারেন্ট ফরমটা বাহিরের কারও হাতে না পড়ে সেটি লক্ষ্য রাখা। এটি প্রতারক চক্রের হাতে গেলে তারা আরেকটি ওয়ারেন্ট দেখে তা নকল করতে পারে।

কোন কোন জিআর শাখায় কতগুলো ওয়ারেন্ট ফরম দেয়া হল তার একটা হিসাব থাকতে হবে। হিসাব না থাকলে সরকারি এ ফরমটি বাইরেও চলে যেতে পারে। জিআরওদের সিএমএম এই ওয়ারেন্ট ফরম সরবরাহ করেন। কিন্তু এ ফরমগুলো ইস্যু করা হল নাকি বাজারে বিক্রি করা হল তার হিসাব নেয়া হয় না। কোর্ট প্রাঙ্গণে ভেন্ডারদের কাছেও আজকাল ওয়ারেন্ট ফরম পাওয়া যায়। এ ধরনের সরকারি ফরম বাইরে বিক্রি অবৈধ হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, তবে এ চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। ফরম পেয়ে গেলে এটা যে কেউ অতি সহজেই তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট যাচাই করা সম্ভব হয় না। কারণ দূর-দূরান্ত থেকে থানায় ওয়ারেন্ট আসে। ফলে পুলিশ ওই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এলে তাকে অযথা হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় বিনা কারণে ১০-১২ দিন কারাভোগও করতে হয়।

শাস্তির নজির নেই : ২০১২ সালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের উমেদার (মাস্টাররোলে ভাড়া করা কর্মচারী) মো. শাহজালাল একটি ভুয়া ওয়ারেন্টের ঘটনায় ধরা পড়েন। তিনি মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের জেনারেল প্রসিডিং (জেপি) শাখায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে গিয়েছিলেন। বিষয়টি জেপি কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের নাজির মাহবুবুল আলম ভুয়া পরোয়ানার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে ওই উমেদারের বিরুদ্ধে প্রতারণা মামলা করেন। ওই মামলায় তাকে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছিল।

এ ছাড়া জেলা জজ আদালতে বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে দুটি দেওয়ানি মামলার ডিক্রি পরিবর্তনের ঘটনা বিচার বিভাগীয় তদন্তে ধরা পড়ে। এরপর অভিযোগটির অধিকতর তদন্তেই আট মাস কেটে গেছে। কিন্তু এখনও এর কোনো কিনারা হয়নি। ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

ভুয়া ওয়ারেন্টে হয়রানির কয়েকটি নমুনা-
নোয়াখালীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে হয়রানি : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের উত্তর হাজিপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান। ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকার আদালতের একটি ওয়ারেন্টের কথা বলে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১২ ডিসেম্বর নোয়াখালীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত তাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান।

এরপর ১৭ জানুয়ারি ঢাকার ষষ্ঠ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে তার জামিন আবেদন করা হলে দেখা যায়, ওই ক্রমিকের কোনো মামলাই এ আদালতে বিচারাধীন নেই। আদালত বিষয়টি বুঝতে পেরে মাহবুবুর রহমানকে ভুয়া অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন। একই বিচারক ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর ভুয়া পরোয়ানায় আটক চাঁদপুরের কচুয়ার দৌলতপুরের আকমত আলীকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

কুমিল্লার দুই ভাইয়ের ১৮ দিন কারাভোগ : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা আপন দুই ভাই আতিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম মজুমদার। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে একটি ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার হয়ে তাদের ১৮ দিন কারাগারে থাকতে হয়। ঢাকা দক্ষিণখান থানার এক মাদক মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়।

প্রতারক চক্র ঢাকার সাত নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করে একটি ওয়ারেন্ট (পি-৪০৩/১৫) জারি করে। পরে ঢাকার আদালত বিষয়টি ধরতে পেরে তাদের জামিনে মুক্তির আদেশ দেন।

বরগুনার সেলিমের ১৪ দিন কারাভোগ : বরগুনা জেলার আমতলীর পূর্ব সোনাখালী এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার হয়ে গত বছর ১৪ দিন কারাগারে কাটাতে হয় তাকে। মিরপুর থানা ২৬(১)১৫ নম্বর মামলার ওয়ারেন্ট মূলে বরগুনা থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

পরে বরগুনার আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুর থানায় করা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় জারি করা ওই ওয়ারেন্টটি ছিল ভুয়া। আদালত পরে তার জামিনে মুক্তির আদেশ দেন।

গাইবান্ধার দিনমজুরের ৮ দিন কারাভোগ : গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কালির খামার গ্রামের মো. মুসলিম আলীর ছেলে আনোয়ার। পেশায় দিনমজুর। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও ভুয়া ওয়ারেন্টে ২০১৫ সালে তাকে ৮ দিন কারাভোগ করতে হয়। অথচ যে ওয়ারেন্ট মূলে গাইবান্ধা থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল সেই ওয়ারেন্টে কোনো মামলা নম্বরই লেখা ছিল না।

২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে আনোয়ারের আইনজীবী বিষয়টি বিচারকের নজরে এনে মুক্তির আবেদন করেন। বিচারক নাজমুল হক শ্যামল শুনানি শেষে আনোয়ারকে দ্রুত কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ দেন।

যশোরের দুই ভাইবোনের ৭ দিন কারাভোগ : যশোর জেলার কেশবপুর থানার বাসিন্দা দুই ভাইবোন মোখলেছুর রহমান ও আছমা খাতুন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার হয়ে সাত দিন কারাগারে কাটাতে হয় তাদের।

Test

আরো দেখুন

একে এম রুহুল আমিন বাবলু,নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার বিএনপি নেতাকর্মী নিয়ে মনোনয়ন ফর্ম জমা’দেন

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, একে এম রুহুল আমিন বাবলু,নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার …

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com